দেশ সাহিত্য

খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিন

পঞ্চানন মল্লিক।। আহ্নিক গতি বার্ষিক গতি সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। নিজ অক্ষের উপর পশ্চিম থেকে পূর্বে একপাক ঘুরে আসাকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলে। অনুরূপভাবে পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে ঘুরতে ৩৬৫দিন বা এক বছরে একবার সূর্যের চারি পাশে প্রদক্ষিণ করে আসে। একে বলা হয় পৃথিবীর বার্ষিক গতি। বার্ষিক গতির ফলেই পৃথিবীতে দিন রাত্রির হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। দক্ষিণ গোলার্ধে সবচেয়ে ছোট দিন হচ্ছে ২৩ ডিসেম্বর। ২৩ ডিসেম্বরের পর দিন আবার আস্তে আস্তে বড় এবং রাত ছোট হতে থাকে। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের ধারনা মতে, ২৩ ডিসেম্বরের পর মূলত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ক্রমান্বয়ে দিন বড় হতে শুরু করে তাই এই দিন বড়দিন। অর্থাৎ এইদিন থেকে বছরের দিন বড় হওয়া শুরু (তথ্য সূত্রঃ আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান)। বড়দিনের তাৎপর্য হচ্ছে এই দিনটি পালিত হয় খ্রিষ্টীয় ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে। যিশু জন্ম গ্রহন করেছিলেন বেথলেহেম শহরে মারীয়া নামে এক কুমারী মাতার গর্ভে। মারিয়া বা মেরী ছিলেন ইসরাইলের নাজারেথবাসী সৎ, ধর্মপ্রাণ সাধু যোসেফের বাগদত্তা। যোসেফ পেশায় একজন কাঠ মিস্ত্রী ছিলেন। যিশুর জন্ম ছিল অলৌকিক। একদিন স্বর্গ দূত গাব্রিয়েল এসে মাতা মারীয়াকে সুসংবাদ দিলেন যে তিনি “মুক্তিদাতা”র মা হবেন। এরকম সংবাদ শুনে মারীয়া প্রথমে ভয় পেলেও পরে ঈশ্বরের ইচ্ছা মনে করে তা মেনে নিলেন। বললেন “আমি ঈশ্বরের দাসী। আমার জীবনে ঈশ্বরের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।” এরপর তিনি মা হতে চললেন। বিয়ের আগেই মেরী সন্তানের মা হচ্ছেন জেনে যোসেফ খুব চিন্তিত হলেন। তিনি মেরীকে গোপনে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু স্বর্গদূত এসে ঈশ্বরের পরিকল্পনা যখন যোসেফের কাছে খুলে বললেন তখন তিনি রাজি হলেন মেরীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করতে। ঠিক সেই সময় রোম সম্রাট সিজার দেশের লোক গননার জন্য সবাইকে শহরে গিয়ে নাম লেখাতে নির্দেশ দিলেন। মারীয়ার স্বামী যোসেফ ছিলেন দায়ুদ বংশের লোক। তিনি মারীয়াকে সঙ্গে নিয়ে নাম লেখাতে গেলেন বেথলেহেম শহরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেল। রাত কাটাবার জন্য তাঁরা অন্য কোন জায়গা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিলেন এক গোশালে। সেখানে তীব্র শীতের গভীর রাতে যিশু খ্রিষ্টের জন্ম হলো অতি সাধারণ ও দীন বেশে।
যিশু খ্রিষ্টের জন্ম দিনকে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসাবে প্রতি বছর পালন করে থাকেন। অবশ্য শুরুতে এমনটা ছিলনা। যে যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে বড়দিন উযযাপন করা হয়, তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর থেকে এটি পালন শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। এটি খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। মহামতি যিশুর আগমন উপলক্ষে তাঁকে সৎকর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত মেনে দিনটি উযযাপন করেন খ্রিষ্টান ধর্মবলম্বীরা। তারা মনে করেন জেরুজালেমের বেথেলহেম শহরে এক গোশালে মাতা মেরীর কোলে জন্ম নেওয়া শিশুটিই ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র। যিনি মানব জাতিকে পাপ থেকে উদ্ধারের পথ প্রদর্শক হিসাবেই পৃথিবীতে অবতীর্ন হয়েছিলেন। তাই তাঁর জন্মদিনটি উযযাপিত হয় বড়দিন হিসাবে। শান্তির বাণী পাঠ, শিশু যিশু আর মাতা মেরীর প্রতীকী রূপের উপসনার মধ্য দিয়ে উযযাপিত হয় এ দিনটি। দিবসটি উপলক্ষে গির্জাগুলো সাজে উৎসবের সাজে। বাড়ি ঘরে করা হয় বর্নিল আলোকসজ্জা। বিভিন্ন চার্চ ও গির্জায় হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কেক কেটে বড়দিনের উৎসব পালন। দেশ, জাতি, মানুষের কল্যাণ কামনায় করা হয় প্রার্থনা।
বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব উযযাপনের ন্যায় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বড়দিনও নির্বিঘেœ, আড়ম্বরের সহিত প্রতিপালিত হয়ে থাকে। এদিন সরকারী ছুটি থাকে। দিনটি উপলক্ষে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা দিনব্যাপী নানান আনন্দ উৎসব ও প্রার্থনায় মেতে ওঠেন। গির্জার আশপাশ ও ক্রিসমাস ট্রি-টি সাজানো হয় রঙিন কাগজ ও অন্যান্য উপকরণে। বসে মেলা। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব বেড়াতে আসেন। সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়। আদান প্রদান করা হয় ক্রিসমাস কার্ড। লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরস্পর কুশল বিনিময় করেন। মেতে ওঠেন নানা হাসি, গল্প আনন্দে। কখনো কখনো এ উপলক্ষে অনুষ্ঠান চলে কয়েকদিন ধরে। হয় নাটক, যাত্রা পালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উৎসব মুখর এসব অনুষ্ঠানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও অংশ নেন সানন্দে। এতে বাড়ে সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ ও ভাতৃত্ব। যিশুর জন্মের উদ্দেশ্য ছিল মানব জাতিকে পাপ থেকে মুক্ত করা, ঈশ্বরের দয়া ও ভালোবাসা মানুষের কাছে প্রকাশ করা,মানূষকে ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া, মানুষে মানুষে পূনঃ পূর্ণ মিলন ঘটানো এবং ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে মিলন ঘটানো। ধর্মীয় উৎসব বড়দিন সেটিই আমাদের শিক্ষা দেয়। এদিন সব হিংসা বিদ্বেশ ভুলে যেন সবাই গেয়ে ওঠেন “ বড় দিন, বড় দিন, বড় দিন, শুভ বড় দিন, বছর ঘুরে এলো আবার মোদের বড় দিন। সুখের ভেলায় ভাসলো হৃদয়, জ্বললো খুশির আলো, এক নিমিশে ঘুচলো সবার মনের দ্বিধা কালো। রাশি রাশি শুভ কামনায় থাকুক অমলিন।” তবে একথা সত্যি যে দিন বদলের সাথে সাথে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক উৎসব। আমাদের নিষ্কৃয়তা,অনীহা বা গুরুত্বের অভাবে দিন দিন লুপ্ত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা আনন্দমুখর উৎসবসমুহ। আবার মনোমালিন্য, দলাদলি,বিভক্তিকরণ ইত্যাদিও বৃদ্ধি পাচ্ছে যেন প্রায় জায়গায়। আগের মত একতা যেন আর কোথাও নেই। সে ধর্মীয় বা সামাজিক যে অনুষ্ঠানই হোকনা কেন। আমাদের সন্তানেরা আজকাল তেমন একটা উৎসবমুখী হচ্ছেনা। বরং তারা ঝুকছে মাদক,পর্ণগ্রাপি কিম্বা ইভটিজিং-এর মত সামাজিক ব্যধির দিকে। আবার আমরা টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়ছি যে আমাদের কৃষ্টি কালচার, সাংস্কৃতি, লোকজ ও গ্রামিন উৎসব,ধর্মীয় উৎসব এসব থেকে ক্রমান্বয়ে যেন বিচ্ছিন্ হয়ে পড়ছি। কিন্তু সেটি আসলে কাম্য নয় কারোরই। পৃথিবীতে অনেক ধরনের ম্যাশিন তৈরি হয়েছে,কিন্তু পাপ খন্ডাবার ম্যাশিন বাজারে মিলেনা বা মেলার কথাও নয়। পাপ ঘোচবার জন্য কিম্বা পূণ্য লাভের আশায় ধর্মীয় অনুশাসন,ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে চলা এবং ধর্মীয় উৎসব ও আচার অনুষ্ঠান যথাযথভাবে প্রতিপালনের বিকল্প কিছু হতে পারেনা। কিন্তু সেগুলো ভুলে কেন যে আমরা টাকার খেলায় এবং প্রতিহিংসায় মেতে উঠছি বুঝিনা।
আসুন খ্রিস্টীয় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিনে আমরা সকল বৈষম্য,বিদ্বেশ, প্রতিহিংসা ভুলে সুষ্ঠ,সুন্দর ও আদর্শ জীবন গঠনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হই ।

লেখক, কলামিস্ট ও কবি : পঞ্চানন মল্লিক